উৎপাদন খাতে ভর করে জিডিপি লক্ষ্য অর্জন চীনের

উৎপাদন খাতের শক্তিশালী উত্থানের ওপর নির্ভর করে ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে চীন।

উৎপাদন খাতের শক্তিশালী উত্থানের ওপর নির্ভর করে ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে চীন। দুর্বল ভোক্তা চাহিদা, আবাসন খাতের অব্যাহত পতন, সরকারি ঋণ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো পরিস্থিতির মাঝে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি গত বছর ৫ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে বলে জানিয়েছে বেইজিং। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির আশঙ্কায় কোম্পানিগুলোর আগাম রফতানি ও দেশটির সরকারের প্রণোদনা উদ্যোগ। খবর এফটি।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এনবিএস গতকাল জানিয়েছে, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) অর্থনীতি ‘বিস্ময়করভাবে পুনরুদ্ধার’ করেছে। তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ধীরগতি থেকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে এ সময় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

জিডিপি তথ্য প্রকাশের সময় এনবিএস জানিয়েছে, ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়িত একগুচ্ছ প্রণোদনা নীতিমালার মাধ্যমে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে আত্মবিশ্বাস কার্যকরভাবে বেড়েছে এবং অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল, ২০২৪ সালে চীন ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। তবে তা অতিক্রম করলেও ২০২৩ সালের ৫ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম। এমনকি কভিড মহামারী প্রভাবিত সময় বাদ দিলে ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত বছর।

এনবিএস এমন সময় প্রবৃদ্ধি প্রতিবেদন প্রকাশ করল, যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিপরীতমুখী গতি বা টু-স্পিড ইকোনমি থেকে পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে চীন। দেশটিতে রফতানি ও উৎপাদন খাতে শক্তিশালী অবস্থা দেখা গেলেও দুর্বল গৃহস্থালি চাহিদা অর্থনীতির গতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে মুদ্রানীতি শিথিলীকরণ ও শেয়ারবাজারে উদ্দীপনা সৃষ্টির ঘোষণা দেয় চীন সরকার। এ সময় স্থানীয় সরকারের ঋণ পুনঃঅর্থায়ন ও অবকাঠামোসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রণোদনা বৃদ্ধির পদক্ষেপ চালু হয়।

তবে চীন স্থায়ী মূল্যসংকোচনের ঝুঁকিতে রয়েছে, এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। কারণ উৎপাদক মূল্য দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ঋণাত্মক স্তরে রয়েছে এবং ডিসেম্বরে ভোক্তা মূল্য মাত্র দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।

এনবিএসের পরিচালক কাং ই এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪ সালকে ‘‌অত্যন্ত অস্থির’ বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, এ সময় তীব্র ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী প্রবণতা বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ করবে চীন। যদিও চলতি বছর বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জ অব্যাহত থাকবে। কারণ নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

কাং ই বলেন, ‘বাহ্যিক অবস্থার প্রতিকূল প্রভাব গভীর হচ্ছে। দেশীয়ভাবে অপর্যাপ্ত চাহিদার পাশাপাশি চাকরি ও আয় প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে রয়েছে।’

প্রতিবেদন অনুসারে, দুর্বল ভোক্তা আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি আবাসন মন্দার কারণে গত বছর খুচরা বিক্রি বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক হয়ে ওঠা শিল্পোৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া চীনের বড় শহরগুলোয় আবাসিক সম্পত্তির দাম কমেছে। তবে সাংহাইয়ে নতুন বাড়ির দাম বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির রয়েছে জনসংখ্যা হ্রাস। ২০২৪ সালে দেশটিতে প্রায় ১৪ লাখ জনসংখ্যা কমেছে, যা টানা তৃতীয় বছরের পতন। আগের বছরের তুলনায় জন্ম সামান্য বেড়ে ৯৫ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছলেও তাকে ছাপিয়ে গেছে ১ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার মৃত্যু।

এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির এশিয়াবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক নিউম্যানের মতে, প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তবে ‘হেডলাইন ফিগার’ বা ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশটির অর্থনীতির কিছু অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখে। তিনি বলেন, ‘মূলত শিল্পোৎপাদনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির উত্থান ঘটেছে, যা মার্কিন আমদানি বিধিনিষেধের পূর্বাভাসের কারণে রফতানির জন্য আগাম উৎপাদনকে নির্দেশ করে। সামনে মার্কিন আমদানি বিধিনিষেধ প্রভাব ফেলা শুরু করলে তা অনিবার্যভাবে অর্থনীতিতে ফুটে উঠবে।’

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ১ লাখ কোটি ডলার। মূলত শক্তিশালী রফতানি প্রবৃদ্ধির কারণে এ রেকর্ড সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে আমদানির বৃদ্ধিতে তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল বেইজিং।

ফ্রেডরিক নিউম্যান আরো বলেন, ‘চীনা অর্থনীতির বর্তমান দুর্বলতা হলো ব্যয়ে অনিচ্ছুক ভোক্তা, যা ভোক্তা ব্যয়ক্ষমতা বাড়াতে আরো উদ্দীপনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করছে।’

অবশ্য চীনের সরকারি ডাটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো এসওয়ার প্রসাদের মতে, চীনা সরকারের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য অর্জন শুধু একটি ‘পাইরিক বিজয়’। অর্থাৎ, চীন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করলেও এজন্য যেসব পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, তা ক্ষতির মতোই। ফলে সরকারি তথ্যের প্রতি বিশ্বাস আরো কমছে এবং অর্থনীতিতে গভীর সমস্যা ও সরকারি নীতির ওপর আস্থা হ্রাস স্পষ্ট।

অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা বলেছেন, চতুর্থ প্রান্তিকের ভালো প্রবৃদ্ধি ‘স্বল্পস্থায়ী হতে পারে’। রফতানির জন্য আগাম উৎপাদন কমে যাওয়া ও অপর্যাপ্ত উদ্দীপনার কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রবৃদ্ধি কমতে পারে।

আরও